আবদুল হামিদ:
আজ জাতীয় সংসদে সাংসদ রুমিন ফারহানার প্রশ্নোত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব খলিলুর রহমান ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে কথা বলেন। তিনি এ চুক্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন ‘ মক্কা প্যাক্টে সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশকে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে আমরা এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’ তিনি আরও বলেন ‘এটি হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা।এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তা নিয়ে কারও উদ্বেগের প্রয়োজন নেই।’
এর পূর্বে গত ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ‘মক্কা চুক্তিতে’ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর ভাষায় মক্কা চুক্তির অংশীদার হতে ঢাকা বিবেচনা করছে।
দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে ‘মক্কা চুক্তিতে’ ঢাকার আগ্রহ পরিষ্কার। সুযোগ পেলে ঢাকা এ বলয়ে যুক্ত হবে।
তার আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার
‘মক্কা চুক্তি’ কী?
অতিসম্প্রতি হওয়া মুসলিম শক্তিধর তিন দেশের একটি সামরিক চুক্তি হলো ‘মক্কা চুক্তি।’ রয়টার্সের খবরে জানা যায় ,গত ৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘Makkah Joint Defence Agreement’-এ স্বাক্ষর করে, যা সংক্ষেপে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত ।
চুক্তির নাম থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক বা সামরিক চুক্তি। এ চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে এ চুক্তিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
ইচ্ছে হলো আর যোগ দিলাম-বিষয়টি এমন নয়। বাংলাদেশের জন্য ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগ দেওয়া শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। ঢাকার এতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ এটি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিকে দারুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
চুক্তিটির আসল কৌশলগত শক্তি কী?
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতার বলয়ে আমরা জানি, সৌদি আরবের শত্রু হলো ইরান, পাকিস্তানের শত্রু ভারত এবং তুরস্কের শত্রুও ভারতসহ অনেকে। এ তিনটি দেশ তিন ধরনের শক্তি নিয়ে এসেছে। সৌদি আরব অর্থ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ব্যয়, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব; তুরস্ক শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তান বড় সামরিক বাহিনী, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে জানান দিচ্ছে ।
এ জোটের দেশসমূহ মনে করছে ভারত কিংবা ইসরায়েলের মতো দেশকে মোকাবিলা করার জন্য তারা এককভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই এ জোটের আত্মপ্রকাশ।
তাহলে বাংলাদেশের শত্রু রাষ্ট্র কে?
‘Friendship to all and malice to none'(সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়)। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এমন মূলনীতি নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। যার কারণে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে ঢাকা পূর্বে তেমনটা ভাবেনি। অবশ্যই অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে এমনটা ভাবার বিষয়ও নয়।
তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে দৃশ্যপট অনেকটা পালটে গেছে। আমাদের চারপাশে ভারত। আমাদের গৃহিত পররাষ্ট্রনীতির সাথে ভারতের স্বার্থ স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাদের স্বার্থের প্রতিকূলে কাজ করলে ভারত শত্রু হতে সময়ের ব্যাপার মাত্র।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা ইস্যু ও আরাকান আর্মিসহ নানাবিধ কারণে মিয়ানমারও আমাদের শত্রু দেশের তালিকায় থাকার কথা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো ন্যায্য কোনো ইস্যুতে এ দু’দেশের সাথে ঢাকার কোনো যুদ্ধ হলে তা সামলানোর মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। এ বিবেচনায় প্রস্তাব পেলে ‘মক্কা চুক্তিতে’ ঢাকার আগ্রহ বেশ যৌক্তিক।
এ চুক্তি ভারতের জন্য কেন অস্বস্তির?
বাংলাদেশের চারপাশে ভারত থাকায়, বাংলাদেশ যদি এমন একটি collective-defence arrangement-এ যোগ দেয়, ভারত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারে যে, বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে যাচ্ছে? বিশেষ করে ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তানের কোনো সামরিক সংঘাত হলে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভারত-পাকিস্তান আজীবন শত্রু রাষ্ট্র হওয়ায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণটা বেশ সংবেদনশীল। ধরা যাক, বাংলাদেশ এ প্যাক্টের সদস্য এবং ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করলো। তাহলে চুক্তির শর্তানুয়ায়ী ভারতকে আক্রমণ করার কথা ঢাকার। দিল্লির এখানে সবচেয়ে বড় ভয় হলো স্বাধীনতার দাবিতে থাকা অঙ্গরাজ্যগুলো বিশৃঙ্খলার ঝুঁকিতে পড়বে।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে দিল্লি আক্রান্ত হলে ঢাকা কী অক্ষত থাকবে? ঢাকা কী আক্রান্ত হবে না? এমন প্রশ্নও ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বাভাবিক।
চুক্তি নিয়ে চীনের অবস্থান কী হতে পারে?
এ চুক্তি নিয়ে চীন এখন পর্যন্ত কোনো কথা বলেনি। এখানে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়। চীন মুখে কুলুপ এঁটেছে। কারণ এ প্যাক্টের সবচেয়ে ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে ভারত। আমরা জানি ভারত চীনের কৌশলগত শত্রু । অন্যদিকে চীন পাকিস্তানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার। আবার সৌদি আরবের সঙ্গেও চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী। বাংলাদেশও চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো বিনিয়োগ,প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম,বাণিজ্য,শিল্প ও যোগাযোগ প্রকল্প ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত।
তাই চীন সম্ভবত বাংলাদেশের এমন একটি পদক্ষেপকে সরাসরি বিরোধিতা করবে না। বরং বাংলাদেশের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে বজায় থাকে, সেটি দেখবে।
যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিকে কীভাবে দেখবে?
আমার বিশ্লেষণ বলছে এখানে দাবার সবচেয়ে বড় গুটিটি চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। তার ইশারায় এ চুক্তি হতে পারে। কারণ এখানে ওয়াশিংটনের হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ব্যবসা রয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত শত্রু।যেখানে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করার কথা সেখানে এমন প্যাক্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিরবতা কেন? ওয়াশিংটন মনে করে দিল্লি এখনো রাশিয়া ব্লকে। তাছাড়া এ প্যাক্টের সব সদস্যই ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এখানে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে দিল্লিকে অশান্ত রাখতে পারলে, মাতব্বরি আর অস্ত্র ব্যবসার পোয়াবারো হতে পারে মার্কিনীদের।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টের সদস্য হলে নিম্নোক্ত সুবিধাসমূহ পেতে পারে।যেমন –
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি: তুরস্ক বর্তমানে সামরিক ড্রোন ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশের জন্য তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাস্তব সুবিধা দিতে পারে।
সামরিক প্রশিক্ষণ: এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
সৌদি আরব ইস্যু: সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক অংশীদার নয়। দেশটি ঢাকার কাছে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও ধর্মীয় সম্পর্কের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা:
বাংলাদেশ যদি একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে তার strategic bargaining power বাড়তে পারে।
চুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী?
আমার মতে চুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তিনটি। যথা –
ঝুঁকি–১: ভারত
এটি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সীমান্ত, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য—অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং পাকিস্তান-সম্পৃক্ত একটি প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের প্রবেশ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক করে তুলতে পারে।
ঝুঁকি–২: অন্য দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া
এটাই collective defence-এর মূল ঝুঁকি।বাংলাদেশ যদি সদস্য হয়, ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তান আক্রান্ত হলে ‘বাংলাদেশ কী করবে?’
যদি চুক্তিতে automatic military সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা কমে যাবে।
ঝুঁকি–৩: বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছে যেখানে
সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়া সেই ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে।
তাহলে বাংলাদেশের কি যোগ দেওয়া উচিত?
এখানে আমার বিশ্লেষণ হলো পূর্ণ সদস্যপদ নেওয়ার আগে বাংলাদেশের কয়েকটি শর্ত নিশ্চিত করা উচিত।
বিশেষ করে চুক্তিকে কোনো-
ক) Automatic war obligation আছে কি না
খ) Defensive-only clause বা চুক্তিটি স্পষ্টভাবে প্রতিরক্ষামূলক কি না
গ) India-related conflict exclusion
বিশেষ করে পাকিস্তান-ভারত সংঘাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামরিক অংশগ্রহণ স্বয়ংক্রিয় কি না?
ঢাকার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং বুদ্ধিমানের কাজ হবে অটোমেটিক ওয়াল অবলিগেশন শর্তে রাজি না হয়ে সদস্যপদ নেওয়া। আমরা এখনো গরিব রাষ্ট্র। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে এখনো দুর্দশা কাটেনি। তাই বেশ ভালোভাবে ভূরাজনৈতিক ঘটনা অধ্যয়ন করেই সামনেই আগানো উচিত। তবে আশার কথা হলো দেশের বিরোধীদলসহ দেশের অধিকাংশ মানুষ এ চুক্তির পক্ষে।
যদিও মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরবর্তীতে কোন কোন দেশ এতে যোগ দেয় তার ওপর। যদি ভবিষ্যতে—
বাংলাদেশসহ মালেশিয়া, মিশর, কাতার প্রভৃতি ইসলামিক রাষ্ট্র এ ধরনের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে এটি একটি বৃহৎ Islamic security architecture-এ পরিণত হতে পারে।
কিন্তু যদি এটি শুধু এই তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি মূলত একটি trilateral strategic defence arrangement হিসেবেই থাকবে।
অতএব, বলা যায় মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগও, ঝুঁকিও।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো তুরস্কের প্রযুক্তি, সৌদির অর্থনৈতিক শক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা। আর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পাকিস্তান-ভারত সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
তাই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন ‘মক্কা চুক্তিতে যোগ দিব কি না?’—এটা নয়।
মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘কী ধরনের শর্তে যোগ দিলে বাংলাদেশ নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে?’
আবদুল হামিদ
ব্যাংকার ও লেখক
২৭ আগস্ট, ২০২৬
